অবৈধ টোল-সংস্কৃতির অবসান হউক


একবিংশ শতাব্দীর কেতাদুরস্ত শব্দ হইল ‘পরিবর্তন’। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে পরিবর্তন-চিন্তাই আজিকার বিশ্বে মুখ্য বিষয়। অথচ এই উপমহাদেশে দেখা যায় উলটা চিত্র। বাহ্যিকভাবে এই জনপদে বিভিন্ন পরিবর্তন আসিয়াছে বটে, তথাপি অনিয়ম-অরাজকতার সংস্কৃতির জাল ছিন্ন করা যায় নাই আজও। বরং বেশ কিছু ক্ষেত্রে দুষ্কৃতকারীদের দৌরাত্ম্য সীমা ছাড়াইয়া গিয়াছে। 

আমরা গভীর উৎকণ্ঠার সহিত লক্ষ করিতেছি, দেশের বিভিন্ন এলাকায় লাগামহীন হইয়া উঠিয়াছে অবৈধ ‘টোল-সংস্কৃতি’। দীর্ঘকাল ধরিয়া সড়ক-মহাসড়কে অবৈধভাবে যেই টোল আদায়ের মহোত্সব চলিয়া আসিতেছে, তাহা এখন ছড়াইয়া পড়িয়াছে জেলা-উপজেলার আনাচকানাচ। কি ট্রাক-বাসস্ট্যান্ড, কি রিকশা-ভ্যান রাখিবার স্থান—সর্বত্রই টোল সিন্ডিকেট এখন ওপেন সিক্রেট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় বসিয়া মফস্সলের ছোটখাটো স্ট্যান্ড হইতেই মাসে কোটি কোটি টাকার মাসোহারা আদায় করিতেছে তাহারা—ভাবা যায়! স্বভাবতই ইহা এখন বড় ধরনের ‘বাণিজ্য’ হইয়া উঠিয়াছে। বাস্তবতা হইল, তাহাদের পিছনে রহিয়াছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। আড়াল হইতে কলকাঠি নাড়ে তাহারাই। আর তাহাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়া থাকে পুলিশ-প্রশাসনের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাহাদের যোগসাজশে চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম হইয়াছে। কেহ কেহ এই শ্রেণির টোল আদায়কারীদের ‘লাঠিয়াল বাহিনী’ হিসাবেও আখ্যায়িত করিয়া থাকেন। লাঠি ছাড়াও তাহাদের হাতে এখন উঠিয়াছে রসিদ বহি। এই বইয়ের তাহারা নাম দিয়াছেন ‘জিপি—জমা পরিশোধ’। যানবাহন চালকদের নিকট হইতে জিপিতে জমা বাবদ জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা হয়, যাহা ভাগবাঁটোয়ারা করা হয় সংশ্লিষ্ট মহলের মধ্যে। টাকা দিতে ব্যর্থ হইলে সেই চালকের যানবাহন আর রাস্তায় নামিতে পারে না। এই পরিস্থিতি মোটেও কাম্য নহে।    

দেশে যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটিয়াছে। অগণিত সড়ক-মহাসড়ক-সেতু নির্মাণের ফলে পণ্য ও সেবা পরিবহন সহজসাধ্য হইয়াছে। অর্থাৎ এই সেক্টর হইতে ব্যাপক সুফল পাইবার কথা; কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই অবৈধ টোল আদায়ের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়িতেছে। আইন ও নিয়মকানুন না মানিবার কারণেই এইরূপ অবৈধ কর্মকাণ্ড গতি লাভ করিতেছে কোথাও কোথাও। এই উপমহাদেশে এখনো আইন মানিবার সংস্কৃতি বিকশিত হয় নাই। বিশেষ করিয়া পরিবহন সেক্টরে ও সড়কপথে অরাজকতার অন্ত নাই। দেশে অবৈধ ব্যাটারিচালিত বাহন চলাচল নিষিদ্ধ হইলেও উৎকোচের বিনিময়ে এই অবৈধ যানবাহন পথে নামিতেছে অহরহ। এই ব্যাপারে হাইকোর্টেরও নির্দেশনা রহিয়াছে; কিন্তু অনেকে আইন ও নির্দেশনার প্রতি কোনোরূপ ভ্রুক্ষেপ করিতেছে না। 

অবশ্য এই মুহূর্তে সমগ্র বিশ্বের অবস্থাও ভালো নহে, টালমাটাল। যুদ্ধবিগ্রহ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার জের সর্বত্র বিরাজমান। এমন দুর্বিষহ দিনে প্রতিটি সেক্টরে নিয়মশৃঙ্খলা ও সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখাটাও কঠিন বইকি। তবে জনদুর্ভোগ নিরসনে পণ্যসামগ্রী ও সেবা স্থানান্তরের প্রশ্নে পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থা নির্ঝঞ্ঝাট রাখিতে পারিলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হইবে। মানুষ ইহার সুফল পাইবে নগদে নগদে। এই জন্য টোল আদায়ের নামে চাঁদাবাজদের প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হইবে। পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনিতে অবৈধ যানবাহন যেমন বন্ধ করিতে হইবে, তেমনি অবৈধ টোল আদায়ের সিন্ডিকেটকেও প্রতিহত করিতে হইবে।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *